মৃত দেহের চিৎকার

মৃত দেহের চিৎকার
মৃত দেহের চিৎকার
 উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, একদা আমি শয়ন কক্ষে বসা ছিলাম। এমন সময় অপ্রত্যাশিত ভাবে রাসূল (সাঃ) সেখানে আগমন করবেন। আমি আমার অভ্যাসানযায়ী দাঁড়াতে চাইলে তিনি এরশাদ করলেন- আয়েশা! নিজ স্থানে থাক। আমি বসে  রইলাম। তিনি চিৎ হয়ে আমারা কলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন। আমি হুযুর (সাঃ) - এর দাড়ি মোবারক সন্ধান করে উনিশটি পাকা দাড়ি দেখতে পেলাম এবং মনে মনে ভাবলাম, আহ! রাসূলন (সাঃ) তাঁর উম্মতকে শোক সাগরে ভাসিয়ে অনন্ত ধামে চলে যাবেন।
এ কথা ভাবতেই আমার চোখ অশ্রুতে পরিপূর্ণ হয়ে গেল এবং কয়েক ফুঁটা অশ্রবিন্দু হুযুরের পবিত্র মুখে পড়ল। এতে হুযুর (সাঃ) জাগ্রত হয়ে বললেন, হে আয়েশা! তুমি কাঁদছ? আমি উত্তরে সব কথা খুলে বললাম। হুযুর (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন,আয়েশা বল তো, কোন অবস্থা মৃত দেহের পক্ষে একেবারে অসহনীয় ও অত্যন্ত ভয়াবহ! আমি বললাম, আল্লাহ্‌ তাআলা এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) এ সম্পর্কে অধিক অবগত।
 হুযুর  (সা:) বললেন, ঠিক বলেছ। তবুও বল তো দেখি? আমি বললাম, মৃত ব্যক্তিকে যখন ঘর থেকে বের করা হয়, তাঁর ছেলে মেয়ে যখন হায় বাবা, হায় মা বলে কাঁদতে কাঁদতে পিছনে পিছনে যায়; আর সে যখন হায় পত্র, হায় কন্যা বলতে থাকে, তখনকার অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ।
হুযুর (সাঃ) এরশাদ করলেন, হ্যাঁ ঠিক বলেছ। বল তো, আর কোন অবস্থা ভয়ঙ্কর?
হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেন, মৃত দেহ যখন কবরে রেখে তাঁর আত্মীয় - স্বজন চলে যায়, তখন তাঁর কৃতকর্ম ছাড়া আর কিছুই তাঁর সাথী থাকবে না, তখনকার সে অবস্থাও ভয়াবহ।
হুযুর (সাঃ) আবার জিজ্ঞেস করলেন- তারপর কোন কোন অবস্থা সঙ্কটজনক?
আয়েশা (রাঃ) বললেন- আল্লাহ্‌ এবং আল্লাহ্‌র রাসুল (সাঃ)-ই বেশী ভাল জানেন। নবী করিম (সাঃ) এরশাদ করলেন- আয়েশা! গোসলদানকারী যখন মৃতকে গোসল দেওয়ার জন্য পোশাক - পরিচ্ছিন, কাপড়- চোপড়, পাগড়ী ইত্যাদি টেনে খোলে তখন মৃতের অসহনীয় কষ্ট হয়। আত্মা যখন তাঁর এ বিবাস্ত্র অবস্থা দেখতে পায় তখন চিৎকার করে বলে, ওহে আল্লাহ্‌র বান্দা! আল্লাহ্‌র কসম! পরিধেয় বস্ত্র আক্তু আস্তে আস্তে খোল । একটু আগেই মাত্র জান কবযের যন্ত্রণা থেকে অব্যাহতি পেয়েছে। এ চিৎকার মানব- দানব ব্যতীত সবাই শুনতে পায়।
মৃতএর দেহে যখন পানি ঢালা হয় তখন পুর্ববৎ চিৎকার করে বলে, ওহে আল্লাহর বান্দা! তুমি আমার দেহে অতি ঠান্ডা পানি ঢেলে কষ্ট দিও না। একটু আগে প্রাণ বের হওয়ার ক্ষত- বিক্ষত হয়েছি। শরীর মলার সময়ও ব্যথা পেতে তদ্রুপ কাকুতি -মিনতি  করে থাকে । কাফন পরিধান করানোর সময় উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করে বলে, তোমরা আমার কাফনের মাথার দিকটা ভিন্ন করে বাঁধ, যাতে আমার আত্মীয়- স্বজনেরা চিরদিনের জন্য আমাকে একবার দেখে নিতে পারে। ঘর হতে বের করার সময় মৃত দেহ বলে, হে আল্লাহর বান্দাগণ! আমাকে আত তাড়াতাড়ি ঘর হতে বের করো না, আমার বাড়ি-ঘর, আত্মীয়-স্বজন, ধন -সম্পদ  শেষবারের মত আমাকে দেখার সুযোগ দাও। আজ হতে আমার সন্তান ইয়াতিম ও স্ত্রী বিধবা হল ,তোমারা তাদেরকে কষ্ট দিও না আমি আমার সব ছেড়ে দিচ্ছি, কোন দিন আমি এর ফিরে আসব না। খাতে করে নিয়ে যাওয়ার সময় বলে, হে বন্ধুগন! আমি আমার পুত্র-কন্যা, আত্মীয়- সবজনকে চিরদিনের জন্য পরিত্যাগ করে যাচ্ছি। সুতরাং আমি যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের কথা বার্তা, কান্নাকাটি শুনতে পাই, ততক্ষন পর্যন্ত তোমার ধীরে ধীরে যাও! খাট বহনকারীগণ তিন কদম অগ্রসর হতেই আবার চিৎকার করে বলে, হে আল্লাহর বান্দাগণামি দুনিয়ার মুখের দিকে চেয়ে জীবন কটিয়েছি। তোমরা যেন তাঁর মুখের দিকে না চাও। সাবধান! দুনিয়া আমাকে নিয়ে যে ছিনিমিনি খেলেছে , তোমাদেরকে নিয়ে তা না করে। আমার অবস্থা দেখে তোমার তোমরা সাবধান হও, পরিণতি ভাল হবে। আমি যা সঞ্চয় করেছিলাম তাআমার আত্মীয়- স্বজন বণ্টন করে নিবে। কিন্তু আমার পাপের বোঝা কেউ বহন করবে না।
জানায়ার নামায সমাধা হওয়ার পর লোকজন চলে জেতে আরাম্ভ করলে আত্মার একেবারে হতাশ হয়ে বলবে, ওহে বন্ধুগণ! এত তাড়াতড়ি তোমরা আমাকে ছেড়ে চললে! দাফন করা পর্যন্ত থাক। মৃত দেহে কবরে রাখা হলে বলবে, হে আমার উত্তরাধিকারীগণ! আমার জিবনের সঞ্চিত ধন- সম্পদ সব কিছু তোমাদের জন্য রেখে গেলাম। তোমারা আমাকে ভুলে যেও না। আমি তোমাদেরকে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করেছি। সুতরাং তোমরা আমার মাগফেরাতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করো। আমার শেষ অনুরোধ, আমাকে ভুলে যেও না।
হযরত আবু কেলাবা (রহঃ) বলেন, আমি একদিন স্বপনে একটি কবরস্থান দেখলাম। সব কবরই ফাটা। কবরবাসীরা নিজ নিজ কবরের পাশে বসা। তাদের সবার সামনে একটি করে উজ্জ্বল আলো , কিন্তু এক ব্যক্তি আলোহীন চিন্তিতাবস্থায় বসে রয়েছে। কারন জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, যাদের সামনে আলো রয়েছে।  তাদের আত্মীয়- স্বজন তাদের জন্য দোয়া এবং দান - খ্য়রাত  করেছে। তাই তারা নূরের পিন্ড পেয়েছে। এর যারা সামনে নূরের পিন্ড নেই সে দুনিয়ায় এক অসৎ পুত্র রেখে আসেছে, সে তাঁর মৃত পিতার জন্য দোয়া- দূরূদ, দান- খয়রাত কছু না করায় তাঁর এ অবস্থায়।
আবু কেলাবা (রহঃ)  দ্বিতীয় দিন ঐ ব্যক্তির ছেলেকে ডেকে স্বপনের কথা বললেন। ছেলে বলল, হযরত ! আমি তওবা করেছি, আজ থেকে আর অন্যায় কাজ করব না, আমার পিতার জন্য দোয়া- দুরূদ পাঠ এবং দান খয়রাত করব। অতঃপর ছেলে ওয়াদানুযায়ী কাজ করতে লাগল।কিছুদিন পর আবু কেবলা (রহঃ) পুনরায় স্বপ্নে দেখলেন, পূর্বের সে নূরহীন ব্যক্তির সামনে সূর্যের চেয়ে উজ্জ্বল একটি নূরের পিন্ড। সে ব্যক্তি বলল, হে আবু কেলাবা। আল্লাহ্‌ আপনাকে আমার চেয়ে অধিক পরস্কৃত করুক।আপনার কারনে কঠিন আযাব থেকে মুক্তি পেয়েছি।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, ইস্কাকাদার দেশীয় এক লোকের সাথে হযরত আযরাঈল (আঃ)- এর সাক্ষাত হয়। লোকটি জিজ্ঞেস করল, আপনি কে? হযরত আযরাঈল (আঃ) বললেন, আমি আযরাঈল।  এ কথা শুনে লোকটি ভয়ে বিহ্বল হয়ে গেল।হযরত আযরাঈল (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন- তুমি কাঁপছ কেন? লোকটি বলল, দোযখের ভয়ে। হযরত আযরাঈল (আঃ) বললেন,আমি কি তোমাকে এমন কিছু লেখে দিব যাতে তুমি পরিত্রাণ পেতে পার। ঐ ব্যক্তি বলল, নিশ্চয়ই।হযরত হযরত আযরাঈল (আঃ) এক খন্ড কাগজে "বিসমিল্লাহির রাহামানির রাহীম" লেখে বললেন, এটা বেশি বেশি পাঠ করো, নাজাত পাবে। এক দরবেশ কোন এক ব্যক্তির "বিসমিল্লাহ্‌" পাঠ করা শুনে চিৎকার করে উঠে বললেন, প্রিয়জনের নামের মধ্যেই যখন এত মধুরতা, না জানি তাঁর দাদীর কত মধুর! লোকে বলে, যমদূতের দুনিয়ায় একেবারেই মূল্যহীন। কেননা, যমদূতই পরম আরাব্ধ প্রিয়জনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার  পথ সুগম করে দেয়।

সূত্রঃ মৃত্যুর আগে ও হাসরের পরে,
পৃষ্টা নং (৫৫-৫৮)

আগের পোষ্ট গুলো যদি মিস করে থাকেন তা হলে নিচের থেকে পরে নিন।

 বাকি পর্ব গুলো পড়ুন 



Comments